বংশাণুসমগ্র যত বড় হবে, তার ধারণ করা তথ্যের পরিমাণও তত বেশি হবে। তবে সেই সম্পূর্ণ তথ্যের মর্মার্থ উদ্ধার করা এখনো পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। জীবদেহে বহুসংখ্যক কোষ থাকে। প্রতিটি কোষ সেই জীবের বিকাশ এবং গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা বহন করে। এই সকল নির্দেশনার সমন্বয়ই হলো বংশাণুসমগ্র যা ডিএনএ কিংবা আরএনএ দিয়ে গঠিত। দেহের প্রতিটি কোষ একই বংশাণুসমগ্র বহন করে, তা ত্বকেরই হোক কিংবা হৃৎপিণ্ডেরই হোক; কিন্তু ঐ কোষের জন্য প্রয়োজনীয় বংশাণুগুলিই কার্যকর হয়ে থাকে।


আন্তর্জাতিক মানব বংশাণুসমগ্র প্রকল্প ১৪ বছর ধরে গবেষণা করে শেষ পর্যন্ত ২০০৩ সালে মানব বংশাণুসমগ্রের ভেতরে অবস্থিত ৩ শত কোটি ডিএনএ বেস জোড়ের পূর্ণাঙ্গ অনুক্রম উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়। এই মানব বংশাণুসমগ্রে একটি মানুষের সমস্ত বংশগতিমূলক তথ্য সঞ্চিত আছে। ভবিষ্যতে এই তথ্য বংশানুক্রমে অর্জিত বিভিন্ন ব্যাধি নির্ণয় ও চিকিৎসায় সাহায্য করবে।

১৯২০ সালে জার্মানির হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞানের অধ্যাপক হান্স ভিংক্‌লার ইংরেজি "জিন" (অর্থাৎ "বংশাণু") ও "ক্রোমোজোম" (অর্থাৎ "বংশসূত্র") পরিভাষা দুইটির অংশবিশেষ জোড়া লাগিয়ে ইংরেজি "জিনোম" পরিভাষাটি উদ্ভাবন করেন।

সাধারণ ব্যাখ্যা

মানুষের বংশাণুসমগ্রকে যদি একটি বইয়ের সাথে তুলনা করা হয়, তবে-

  • এই বইয়ে ২৩টি অধ্যায় থাকবে;
  • প্রতিটি অধ্যায়ে ২৫ কোটি থেকে ৪৮ কোটি অক্ষর থাকবে, যাদেরকে A, T, G এবং C দ্বারা চিহ্নিত করা যায়;
  • প্রতিটি বই ৩ শত ২০ কোটিরও বেশি অক্ষর বহন করেবে;
  • এই বইটি সূচ্যগ্র পরিমাণ জায়গার চেয়েও কম জায়গায় আঁটবে;
  • এই বইয়ের অন্তত একটি করে অনুলিপি বা কপি দেহের প্রায় প্রতিটি কোষেই থাকবে।

দীর্ঘতম বংশাণুসমগ্র অনুক্রম

প্যারিস জাপোনিকা নামের একটি ফুলগাছের বংশাণুসমগ্র জীবজগতে দীর্ঘতম বলে আবিষ্কৃত হয়েছে। ফুলটি আকারে ছোট, শুভ্র বর্ণ। পাহাড়ী এ ফুলটির বিকাশের গতি অত্যন্ত ধীর। এটি জাপানের হনশু দ্বীপের স্থানীয় একটি উদ্ভিদ। সচরাচর অন্য কোথাও দেখা যায় না। তবে যুক্তরাজ্যের কিউি গার্ডেনস্‌ নামক উদ্যানে এই ফুলের চাষ করা হয়েছে। কিউই গার্ডেনস্‌-এ কর্মরত গবেষকরা আবিষ্কার করেন যে এই ফুলের বংশাণুসমগ্র অনুক্রম মানুষের বংশাণুসমগ্রের তুলনায় ৫০ গুণ দীর্ঘ। এই ফুলের বংশাণুসমগ্রে ১৫ হাজার কোটি বেস জোড় রয়েছে। এর তুলনায় মানুষের বংশাণুসমগ্রে রয়েছে মাত্র তিন শত কোটি বেস জোড়। প্যারিস জাপোনিকার একটিমাত্র কোষের বংশগতিমূলক তথ্য যদি একটি পংক্তিতে বিন্যস্ত করা হয় তাহলে সেই পংক্তিটি ৩২৮ ফুট দীর্ঘ হবে। অপরদিকে মানুষের একটি কোষের বংশগতিমূলক তথ্য জোড়া লাগিয়ে একটি পংক্তিতে সাজালে তার সম্পূর্ণ দৈর্ঘ্য হবে মাত্র সাড়ে ছয় ফুট। এর আগে প্রোটোপটিরাস ইথিওপিকাস (marbled lungfish) নামক আফ্রিকান একটি মাছ ছিল সর্বাধিক দীর্ঘ বংশাণুসমগ্র সংবলিত জীব।