কিন্তু সবচেয়ে দুর্ধর্ষ হলেন মাঝের শ্রেণীর ব্যক্তিরা। তাদের দূর পাহাড়ের গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়া নেই। তারা মুগ্ধ হয়ে পড়েন রহস্যঘন বনটাকে নিয়ে। সেখান হতে ভেসে আসা গুরু-গম্ভীর সব ডাক তাদের রক্তে শিহরণ জাগায়। অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় তারা তখন কোমরে একটা ছুরি গুঁজেই ঢুকে পড়েন সেখানে। আঁধারে ছেয়ে থাকা গা ছমছমে অরণ্যের প্রতিটা লতা-পাতা, শাখা-প্রশাখায় তারা বিচরণ করে বেড়ান অবাক বিস্ময় নিয়ে। টারজানের মতো খালি হাতে পিটিয়ে মারেন ডাঙ্গার বাঘ, আর জলের কুমীরদের। আমাদের আজকের আয়োজন মাঝের এই দুর্ধর্ষ শ্রেণীর দুর্ধর্ষতর কয়েকজন অভিযাত্রীদেরকে নিয়ে, যারা গণিতশাস্ত্র চর্চা করে গিয়েছিলেন শুধুমাত্র নিখাদ মুগ্ধতা ও ভালোবাসা হতে। সেই পথ আদৌ তাদের বনের ওপাশে কোনো গন্তব্যে নিয়ে পৌঁছাবে কিনা, সেটা নিয়ে মাথা ঘামাননি তারা। গণিতশাস্ত্রের এমন দুর্ধর্ষ ১০ জনের কথা তুলে ধরা হলো এই সিরিজে।
(প্রতিটা ব্যক্তির ইতিহাসের সাথে একটা করে রেটিং জুড়ে দিয়েছি ‘জাস্ট ফর এক্সট্রা ফান’। কিন্তু সত্যি কথা হলো, তাদেরকে বিচার করার সাধ্য আমার নেই। কারোরই নেই। তাহলে কেন এই রেটিং? যদি ৫ম পর্ব পর্যন্ত ধৈর্য ধরে থাকতে পারেন, তাহলে বুঝবেন!)
আর্যভট (৪৭৬ খ্রিস্টাব্দ-৫৫০ খ্রিস্টাব্দ)
কেন তিনি দুর্ধর্ষ?
তিনি ভারতীয় গণিতশাস্ত্রে সংখ্যাদের স্থানাংকের (অর্থাৎ একক-দশক-শতক-সহস্র-অযুত-লক্ষ-নিযুত ইত্যাদি ইত্যাদি) ধারণা প্রচলন করেন। তবে তিনি সংখ্যা লিখতে ১, ২, ৩ ইত্যাদি ব্যবহার করেননি। তিনি ব্যবহার করেছিলেন ব্রাহ্মীলিপির অক্ষরদের (অনেকটা রোমান I, II, III………….IX, X- এর মতো)। মাত্র ২৩ বছর বয়সে লিখে ফেলেছিলেন ‘আর্যভট্ট’ নামক এক তৎকালীন “বেস্টসেলার” বই। বইয়ের নামটা তিনি দেননি। তাঁর সাগরেদরাই পরে গুরু ‘আর্যভট’-এর আলোচিত সব তত্ত্বের এই সংকলনটাকে নাম দিয়েছিলেন ‘আর্যভট্ট’। এই বইয়ে আলোচিত হয়েছিলো পাটিগণিত, বীজগণিত, সমতল ত্রিকোণমিতি, গোলকীয় ত্রিকোণমিতি, রেলগাড়ির মতো চলতে থাকা সব ভগ্নাংশদের চরিত্র, দ্বি-ঘাত সমীকরণ, সূচক বিশিষ্ট সংখ্যাদের সিরিজের যোগফল নির্ণয় সহ বর্তমানে একটা স্কুল-পড়ুয়া বাচ্চার শৈশবের পুরো ‘তেষ’ মারতে যা যা প্রয়োজন তার সবই।
সেই সাথে লিখেছিলেন ‘আর্যসিদ্ধান্ত’ নামক এক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত বইও। ভারতীয়দের মাঝে আর্যভট সর্বপ্রথম পাইয়ের মান দশমিকের পর চার ঘর পর্যন্ত (৩.১৪১৬) নির্ভুল গণনায় সক্ষম হন। শুধু তাই নয়। তিনিই প্রথম উপলব্ধিতে আসেন- পাইয়ের এই মান আসলে ১০০% খাঁটি নয়। বরং এটা ‘আসন্ন মান’। ৩.১৪১৫……… এর পরেও আরো সংখ্যা আছে, যেগুলো তখনো বের করা যাচ্ছিলো না। যদি ইতিহাসবিদদের এই বক্তব্য সঠিক হয়, তবে বলা যায়- ১৭৬১ সালে গণিতবিদ ‘ল্যাম্বার্ট’ নয়, বরং আর্যভটই বহু শতাব্দী আগে পাই যে একটা ‘অমূলদ সংখ্যা’ সেটা ধরতে পেরেছিলেন।
তিনি ত্রিভুজ ও বৃত্তের ক্ষেত্রফলের সূত্র প্রদান করেন। ৮ম ও ৯ম শতকের আরবের গণিতবিদেরা আর্যভটের কাছে চরমভাবে ঋণী। তাঁরা বীজগণিত ও ত্রিকোণমিতিতে সরাসরি আর্যভটের রেখে যাওয়া গ্রন্থ ‘আর্যভট্ট’-এর সহায়তা নিয়েছিলেন। গণিতবিদ ‘আল-খোয়ারিজমি’ তাঁর বীজগণিতের বইয়ে সরাসরি আর্যভটের নাম উল্লেখ করেছিলেন। এদিকে ‘আল-বিরুনী’ তাঁর জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কিত লেখায় উল্লেখ করেছিলেন আর্যভটের ‘আর্যসিদ্ধান্ত’ বইয়ের সহায়তার কথা।
আর্যভট উল্লেখ করে গিয়েছিলেন ‘জ্যা’ এবং ‘কোজ্যা’-দের কথা। বিভিন্ন ডিগ্রীর কোণের জন্যে এই জ্যা এবং কোজ্যা-দের মানের একটা বিশাল তালিকাও তৈরি করে দিয়ে গেছিলেন তিনি। এই জ্যা এবং কোজ্যা-ই হলো আজকের ত্রিকোণমিতির ‘Sine’ এবং ‘Cosine’. কিন্তু ‘জ্যা – কোজ্যা’ এর নাম ‘Sine – Cosine’ হয়ে গেলো কীভাবে? যখন আরবের গণিতবিদেরা আর্যভটের বই অনুবাদ করেছিলেন, তখন তাঁরা জ্যা-এর আরবি অনুবাদ করেছিলেন ‘Jba’, যেটা আরো পরে লাতিনে অনুবাদের সময়ে হয়ে গেছিলো ‘Jiba’. লাতিনে যারা অনুবাদ করেছিলেন, তারা ধরে নিলেন এটা আসলে Jiba নয়, এটা হচ্ছে আরবি শব্দ Jaib- যার মানে হচ্ছে জামার পকেট। জ্যা কে দেখতে যেহেতু কিছুটা পকেটের মতো দেখায়, তাই লাতিন বিশেষজ্ঞরা ধরে নিলেন আর্যভট জ্যা (পরে আরবিতে Jba, Jiba এবং Jaib) বলতে পকেটের সাথেই তুলনা বুঝিয়েছেন। ফলে সেই সাথে নাম মিলিয়ে তারা মূল Sinus শব্দ হতে জ্যা-এর এর ল্যাটিন নাম রাখলো ‘Sine’। এর মানে হচ্ছে জামার কিনারের ভাঁজ। কোজ্যা-এর নাম হয়ে গেলো ‘Cosine’.
তিনি দ্বি-ঘাত সমীকরণ সমাধানের আরো সহজ উপায় বাতলে দিয়েছিলেন। তাঁর পদ্ধতিতে এই সমীকরণদের ধাপে ধাপে ভেঙ্গে সমাধান করতে হয়। এদিকে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানেও দেখিয়েছিলেন তাঁর গাণিতিক প্রতিভার ঝলক। যে সময়ে মানুষেরা বিশ্বাস করতো পৃথিবী একটা থালার ন্যায় সমতল, আর তার নিচে চারটা হাতি সেই থালাকে ধরে আছে, ঠিক সেই সময়ে আর্যভট দাবী করলেন- পৃথিবী গোলাকার। শুধু তাই নয়। তিনি নিখুঁতভাবে পৃথিবীর পরিধি নির্ণয় করেছিলেন, যদিও তার অনেক বছর আগেই গ্রীক গণিতবিদ ও বিজ্ঞানী এরাটোসথিনিস সেটা নির্ণয় করেছিলেন। তাঁর মাপ অনুযায়ী পৃথিবীর পরিধি পাওয়া গেছিলো ৪৯৬৭ যোজন। ১ যোজন = ৫ মাইল। তাহলে ৪৯৬৭ যোজন = ২৪,৮৩৫ মাইল। আধুনিক হিসাবে এই মান ধরা হয় ২৪,৯০২ মাইল। এখানেও তিনি থেমে থাকেননি। তিনিই সর্বপ্রথম দাবি করেন যে পৃথিবী তার নিজ অক্ষের উপরে ঘুরছে! ফলে দেখা যায় তারারাও আকাশে এক স্থান হতে আরেক স্থানে বিচরণ করে চলছে। তিনি এও বলেন পৃথিবী এবং অন্যান্য গ্রহদের কক্ষপথ আসলে উপবৃত্তাকার। তাঁর শিষ্যরা (ভাস্কর, ব্রহ্ম গুপ্ত, বরাহমিহির) এসব ‘বিস্ফোরক’ মার্কা বক্তব্য ঠিক হজম করতে পারেননি। তখনকার প্রচলিত মতবাদ ছিলো- পৃথিবী স্থির, আকাশ ঘোরে। তাই তাঁর মৃত্যুর পরে যখন তার রেখে যাওয়া পুস্তক নিয়ে তারা অধ্যয়ন করেন, তাদের পেটের ভিতরে মোচড় মেরে ওঠে গুরুর এসব ‘আবোল-তাবোল’ বক্তব্য পড়ে। তখন কেউ যাতে তাঁকে ‘নাস্তিক’ দাবি করে তার ‘পু/ফাঁসি’ চাইতে না পারে, সেজন্য ভাস্কর, ব্রহ্ম গুপ্ত, বরাহমিহির প্রমুখ পণ্ডিতেরা গুরুর লেখাগুলোকে ‘ভাইরাল’ হয়ে যাবার আগেই কেটে-ছিঁড়ে ফর্দাফাঁই করে নিজেদের পছন্দমতো আবার নতুন করে লিখে দেন। এভাবেই তারা সমাজে তাদের গুরুর ইমেজ রক্ষা করেন!
লেখা: প্রিন্স
ফাইল ডাউনলোড

0 মন্তব্যসমূহ